জনপ্রিয় সংবাদ

x

মেঘনা গ্রুপের নদী দখল উৎসব চলছে নজিরবিহীনভাবে

রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ১১:০৮ পূর্বাহ্ণ | 33 বার

মেঘনা গ্রুপের নদী দখল উৎসব চলছে নজিরবিহীনভাবে

দিনে দিনে ‘ভয়াল দানব’ হয়ে উঠেছে মেঘনা গ্রুপ। গ্রুপটির চোখের সামনে যা পড়ছে তা-ই গিলে খাচ্ছে। ফসলি জমি, ভিটেমাটি, খাসজমি, খাল, নদী কোনো কিছুই বাদ পড়ছে না। সবই তার বিশাল বপুর পেটে ঢুকে যাচ্ছে অনায়াসে। নিজের শিল্পাঞ্চল গড়ে তুলতে এরই মধ্যে কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম নিশ্চিহ্ন করেও ক্ষান্ত হয়নি মেঘনা গ্রুপ। দখল করে নিয়েছে নদীর বিস্তীর্ণ অঞ্চল। গ্রুপটি এবার দখলের থাবা বাড়িয়েছে জনবসতির দিকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অজ্ঞাত ক্ষমতার জোরে, ভুয়া দলিলের মাধ্যমে মানুষের বসতবাড়ি, খাসজমি ও সরকারি খাল নির্বিঘ্নে দখল করে নিচ্ছে মেঘনা গ্রুপ। মেঘনা লঞ্চঘাট, ঝাউচর, প্রতাপের চর ও কাদিরগঞ্জ এলাকায়ও পড়েছে মেঘনা গ্রুপের দখলবাজির থাবা। উপজেলার গঙ্গানগর এবং পাওয়ার প্লান্ট এলাকায়ও নদীর বিশাল এলাকা দখল করেছে মেঘনা গ্রুপ। আষাঢ়িয়ার চর এলাকায় মেঘনা ও মেনীখালী নদীর প্রায় ২ কিলোমিটার বক্ষ ও তীরবর্তী জমি বালু দিয়ে ভরাট করে দখলে নিয়েছে নদীখেকো মেঘনা গ্রুপ।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে সোনারগাঁ উপজেলার বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের আনন্দবাজার এলাকায় মেঘনা নদীর প্রায় ৫০০ ফুট জায়গা দখল করে মেঘনা গ্রুপকে মাটি ভরাট করতে দেখা যায়।

ফলে হুমকির মুখে পড়েছে শত বছরের পুরনো ও লক্ষাধিক মানুষের সমাগমস্থল আনন্দবাজার। বৈদ্যেরবাজার ইউনিয়নের নরসুলদী, পূর্ব দামোদর, টেংগার চর ও নয়াপাড়া মৌজায় অবস্থিত স্থানীয় জনগণের প্রায় ২০০ বিঘা জমি অবৈধ ও ভুয়া দলিলের মাধ্যমে দখলও করে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ। এ ছাড়া পিরোজপুর ইউনিয়নের ছয়হিস্যা, কান্দারগাঁও, জৈনপুর, চরভবনাথপুর, দুধঘাটা, কুরবানপুর এলাকার নদী এবং সরকারি খাসজমিসহ ১০০ বিঘা জমি গ্রাস করে নিয়েছে গ্রুপটি। এর পরও থামছে না তাদের দখলবাজির দৌরাত্ম্য। শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের নামে নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে মেঘনা নদীসহ তীরবর্তী জনপদ ঘিরে মেঘনা গ্রুপের দখলবাজি মহোৎসব চলছেই।

এরই মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি সোনারগাঁ উপজেলার প্রায় ২ কিলোমিটার নদী দখল করে নিয়েছে। এখনো কোথাও কোথাও চলছে বালু ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণের কাজ। একই সঙ্গে চলছে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জমি দখল। এতে সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ। উপজেলার পিরোজপুর ইউনিয়নের ছয়হিস্যা গ্রামের আহসান উল্লাহ বলেন, ‘মেঘনা গ্রুপ ভুয়া দলিলের মাধ্যমে আমার ১৬ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে। ’ একই কায়দায় ২০.১০.১৬ তারিখে স্থানীয় বাসিন্দা হাকিমুনের ১৬ শতাংশ জমি (দলিল নম্বর-১২৯৬০) তারা জাল দলিল করে। ১১.০৮.১৬ তারিখে আবদুল জব্বারের ০.১৩৮০ শতাংশ জমি (দলিল নম্বর-৯৭৬৫) ভুয়া মালিক সাজিয়ে কোম্পানির নামে দখল করে নেয় মেঘনা গ্রুপ। ২০.১০.১৬ তারিখে তমিজের ০.২৮০০ শতাংশ জমি (দলিল নম্বর-১২৯৬১) নিজেদের নামে লিখে নেয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানটি। এ ছাড়া মহরাজের ০.০৪০০ শতাংশ, রহমত আলীর ০.১৮২০ শতাংশ, মজিবর ও আয়েশার ০.৪৩০০, ০.১০২৫ ও ০.২৮০০ শতাংশ, মোহাম্মদ আলীর ০.০৭৫৪ শতাংশ, নাছিম উদ্দিনের ০.১৯৭০ শতাংশ, আবু সাঈদের ০.২০৫০ শতাংশ এবং আলাউদ্দিনের ০.২৮০০ শতাংশ জমি জাল দলিলের মাধ্যমে দখল করে নেয় মেঘনা গ্রুপ। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মেঘনা নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে ৫০০-৭০০ ফুট ভিতরে ঢুকেও নদী দখলের তুঘলকি কান্ড ঘটিয়েছে মেঘনা গ্রুপ। উপজেলার আষাঢ়িয়ার চর ও ঝাউচর এলাকায় মেনীখালী নদীর অধিকাংশ জায়গাজুড়ে বালু ভরাট করে ফেলেছে তারা। অন্যদিকে আনন্দবাজার এলাকায় নদীর প্রায় ৫০ একর জমি দখল করে নিয়েছে মেঘনা গ্রুপ।

নদীগর্ভের প্রায় ৭০০ ফুট দখলে নিয়ে তড়িঘড়ি সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করেছে তারা। হাড়িয়া এলাকায় মেঘনা নদীতে অবৈধ স্থাপনা ও জেটি নির্মাণ করেও দখল করে নিয়েছে শিল্পগ্রুপটি। নদীগর্ভের প্রায় ৭০০ ফুট ভরাট করে পাইলিংয়ের মাধ্যমে নদী দখল পাকাপোক্ত করছে তারা। মেঘনার শাখা ঐতিহাসিক সরকারি রান্দীর খালের প্রায় ২ কিলোমিটার এলাকা বালু দিয়ে ভরাটসহ নদীর প্রায় দেড় হাজার বিঘা জমি ভরাট করে চারদিকে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের কাজ করছে মেঘনা গ্রুপ। ছয়হিস্যা ও দুধঘাটা এলাকায় বালু ভরাট করে চলছে শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজ।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, নদীখেকো মেঘনা গ্রুপের সঙ্গে পরিবেশ অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয় ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ কার্যালয়, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর গভীর সুসম্পর্ক রয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর স্থানীয় কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে মেঘনা গ্রুপের নদীডাকাতি চলছে প্রকাশ্যেই। প্রতিনিয়ত নদীতে পাইলিং, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও বালু ফেলে নদীগর্ভে প্রবেশ করছে মেঘনা গ্রুপ। নদীখেকো মেঘনা গ্রুপ যখন নদীডাকাতিতে মরিয়া, তখন উপজেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও পরিবেশ অধিদফতরের স্থানীয় পর্যায়ের কর্মকর্তারা পরস্পরের ওপর দায় চাপাতে ব্যস্ত থাকছেন।

নদী দখলের বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পরিবেশ অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়, বিআইডব্লিউটিএ, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন ও সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। অন্যদিকে সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নদী দখলের বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। অবৈধভাবে নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে ঘুরেও কোনো প্রতিকার পাননি ভুক্তভোগীরা।

নদী দখল, সরকারি খাল ও কৃষিজমি রক্ষার প্রতিবাদে স্থানীয় এলাকাবাসী ও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আন্দোলন-সংগ্রাম, কয়েক দফা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, সড়ক অবরোধ ও বিভিন্ন দফতরে স্মারকলিপি প্রদানের পরও কোনো লাভ হয়নি।

নোটিস দিয়েই দায়িত্ব শেষ :

সোনারগাঁ উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, নদী দখলের অভিযোগে মেঘনাঘাট এলাকার মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নদী ও সরকারি সম্পত্তি এবং খাসজমির দখল ছেড়ে দিতে চূড়ান্ত নোটিস প্রদান করেছে সোনারগাঁ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)-এর কার্যালয়। ওই নোটিসের প্রায় এক বছর অতিবাহিত হলেও রহস্যজনক কারণে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি তারা। সোনারগাঁয়ে নদীতীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা মেঘনা গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদী ও খাল দখলের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এবং এর প্রমাণ পাওয়ার পরও নোটিস প্রদান ছাড়া কার্যত কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি উপজেলা প্রশাসন। এ ছাড়া হাজার হাজার একর জমি নদীখেকো মেঘনা গ্রুপের পক্ষে নামজারি ও জমাভাগের পূর্বানুমতি দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে ওই সব জমি নামজারি করে ভূমি উন্নয়ন কর নিচ্ছে সহকারী কমিশনার (ভূমি) এবং ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয়। পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে, পরিবেশ আইন অনুযায়ী, যে কোনো আবাসন বা বড় উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (ইআইএ) করে এর অনুমোদন নিতে হয়। প্রয়োজন হয় অবস্থানগত ছাড়পত্রের। এসব ছাড়পত্র পেলে তবেই মাটি ভরাটসহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ পরিচালনা করার বিধান রয়েছে। কিন্তু মেঘনা নদীতে নদীখেকো শিল্পপ্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ এই পক্রিয়া অবলম্বন না করে এবং পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়াই বালু ভরাট করে নদী ও কৃষকের জমি জোরপূর্বক দখল করে নিচ্ছে। তবে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদফতরের নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয় দায় নিতে নারাজ। তারা উল্টো দায় চাপাচ্ছে জেলা প্রশাসনের ওপর। এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের রিট মামলার আদেশ এবং আদালতের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, নদীতীরবর্তী ৫০ মিটার ভূমিতে বালু ও মাটি ভরাটসহ যে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। নদীতীরবর্তী মেঘনা গ্রুপের কাজ বন্ধে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তারা বীরদর্পে নদী দখল ও ভরাট করে স্থাপনা নির্মাণ করে চলেছে।

Development by: webnewsdesign.com