সর্বশেষ সংবাদ

x



ব্যবসায়ীদের ফাঁকা চেক দিয়ে তিনি এখন কোটি টাকার মালিক !

শুক্রবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | ৯:৫০ অপরাহ্ণ | 122 বার

ব্যবসায়ীদের ফাঁকা চেক দিয়ে তিনি এখন কোটি টাকার মালিক !
জাল টাকার একটি লেনদেন করার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন মশিউর রহমান খানকে ।

বহুজনের সঙ্গে লাখ লাখ টাকার পণ্য কেনার ব্যবসায়িক চুক্তি করেন মশিউর রহমান খান (৪৮)। পাঁচ তারকা হোটেল ছাড়া ব্যবসায়িক কোনো সভাতেই বসেন না তিনি। তিন মাসের জন্য আলিশান অফিস ভাড়া নেন এবং চলাচল করেন দামি গাড়িতে।

আস্থায় নিতে অগ্রিম কিছু টাকাও দিয়ে দেন এই ভয়ংকর প্রতারক। ব্যবসায়ী যখন অগাধ বিশ্বাসে সব পণ্য সরবরাহ করেন তখনই শুরু হয় তার টালবাহানা। টাকা আজ দিচ্ছেন তো কাল, এমন করে ব্যবসায়ীদের ঘোরাতে থাকেন। আর মাস তিনেক পেরোতে না পেরোতেই তিনি লাখ লাখ টাকার পণ্য নিয়ে লাপাত্তা। আর তখন ব্যবসায়ীর হাতে পড়ে থাকে কেবল কিছু ফাঁকা (ডিজঅনার) চেক।



গত ২৫ বছরে এমন অনেক প্রতারণা করে ওই ব্যক্তি বহু ব্যবসায়ীর কাছে ফাঁকা চেক দিয়ে নিজে হাতিয়ে নিয়েছেন অন্তত ২৫ কোটি টাকা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) অভিযানে ধরা পড়েছে মশিউর রহমান নামের এই মহাপ্রতারক। তিনি এরইমধ্যে ব্যবসার নামে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তাঁর বাড়ি গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায়। থাকেন রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকায়।

মঙ্গলবার (১০ সেপ্টেম্বর ) রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে জাল ডলারের মাধ্যমে প্রতারণার মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের নির্দেশে তাকে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

ডিবির কর্মকর্তারা জানান, মশিউর ও তার স্ত্রী সাবরিনা রহমানসহ সহযোগিদের বিরুদ্ধে পল্টন, বনানী, গুলশানসহ কয়েকটি থানায় দুই ডজনের বেশি মামলা আছে। কয়েকটি মামলায় আদালতে তার সাজা এবং গ্রেপ্তারে পরোয়ানা জারি হয়েছে।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, সবুজবাগ এলাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁর কাছ থেকে ৩ লাখ ৩৬ হাজার টাকার জাল নোট এবং ৬ হাজার মার্কিন ডলার জব্দ করা হয়। ভুক্তভোগী লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে এই ব্যক্তি অন্তত ২৫ কোটি টাকার পণ্য প্রতারণা করে হাতিয়ে নিয়েছেন।

মশিউর রহমানকে জিজ্ঞাসা করছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে আজ বৃহস্পতিবার মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে আসেন অনেক প্রতারিত ও ভুক্তভোগী ব্যক্তি। তাঁদের কেউ ব্যবসায়িক চুক্তি অনুযায়ী মশিউরকে লাখ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক্স পণ্য সরবরাহ করেছিলেন। কেউ চাল, কেউ আলু কেউবা হার্ডওয়ার সামগ্রী সরবরাহ করেছিলেন।

আজম হোসাইন নামের এক ব্যবসায়ী বলেন, গত বছরের জুন মাসে মশিউরের সঙ্গে একটি ব্যবসায়িক চুক্তি হয়েছিল তাঁদের। তখন তাঁর অফিস ছিল বনানী ৪ নম্বর সড়কে। চুক্তি অনুযায়ী ৪২টি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) তাঁকে সরবরাহ করেন। এরপর তাঁরা যখন টাকা চাইতে যান, তখন আজ-কাল করে তাঁদের ঘোরাতে থাকেন। কয়েকটি চেক দেন। কিন্তু ব্যাংক থেকে যখন টাকা তুলতে যান তখন দেখেন অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা নেই।

বেঙ্গল গ্রুপের ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) দেবাশীষ বড়ুয়া বলেন, বেঙ্গলের লিনেক্স ইলেকট্রনিকস থেকে গত বছর ৫৩ লাখ টাকার জিনিসপত্র কিনেছিলেন মশিউর রহমান। এক মাস পেরিয়ে গেলেও তিনি যখন টাকা দিচ্ছিলেন না, তখন তাঁর গোডাউন থেকে তাঁরা পণ্যগুলো ফেরত নিয়ে আসেন। কিন্তু তত দিনে ৬ লাখ ২৩ হাজার ৭ টাকার পণ্য মশিউর বিক্রি করে দেন। সেই টাকাটা তাঁরা আর পাননি।

মো. বিলাল হোসেন নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, তাঁদের কাছ থেকে ২৫টি এসি কিনেছিলেন মশিউর। চুক্তির পরপরই ২০ শতাংশ টাকা অগ্রিম দিয়ে দেন। তাঁরা যখন সব এসি সরবরাহ করেন, তখন মশিউর ১১ লাখ ৯৬ হাজার টাকার একটি চেক দেন তাঁদের। কিন্তু চেকটির বিপরীতে কোনো ব্যাংকে গিয়ে তাঁরা কোনো টাকা পাননি। ফিরে এসে দেখেন মশিউর নেই, তাঁর কার্যালয়ও বন্ধ।

খিলগাঁও অঞ্চলের অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহিদুর রহমান বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গত তিন মাস ধরে মশিউরের সন্ধান করছিলেন তাঁরা। বুধবার জাল টাকার একটি লেনদেন করার সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন।

তিনি বলেন, ২০-২৫ বছর ধরে মশিউর এই কাজ করে আসছেন। এখন পর্যন্ত রাজধানীর উত্তরা, বনানী, নিকুঞ্জ, শান্তিনগর ও পল্টনে বিভিন্ন সময়ে তাঁর কার্যালয় ছিল বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। ভুক্তভোগী লোকজনের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ, অন্তত ২৫ কোটি টাকার পণ্য মশিউর বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রতারণা করে নিয়েছেন। তবে টাকার অঙ্ক আরও বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

শাহিদুর রহমান বলেন, পাঁচ থেকে সাতজনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই কাজটি করে থাকে। অন্যদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

ভুক্তভোগী মেজর (অব.) সাকিল হোসেন খাঁন বলেন, তাকেও চাল কেনার প্রস্তাব দেয় মশিউর। একই সময় সে এলসি করার কথা বলে নগদ ৫০ লাখ টাকা ধার চায়। চলতি বছর ২২ ফেব্রুয়ারি তাকে ৫০ লাখ টাকা দেন সাকিল। টাকা নেওয়ার সময় মশিউর মার্কেন্টাইল ব্যাংকের একটি হিসাব নম্বরের ৫০ লাখ টাকার চেক দেয়। পরে সাকিল দেখেন ওই হিসাবে টাকাই নেই।

মেজর মোতাহারুল ইসলাম (অব.) নামে এক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, মশিউরের সঙ্গে চালের ব্যবসা করার সুবাদে দেড় বছর আগে তার পরিচয় হয়। বনানীর ১ নম্বর রোডের ২৩ নম্বর বাসায় ‘স্বপ্ন টেডিং এজেন্সি’ নামে প্রতিষ্ঠানও ছিল তার। সেখানে গেলে বলে নওগাঁর একটি বন্ধ মিলের মালিক। মিলটি চালু করার পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে তার সঙ্গে শেয়ারে ব্যবসা করার প্রস্তাব দেয়।

পরে মোতাহারুল অর্ধেক নগদ টাকা এবং অর্ধেক ব্যাংক চেকের মাধ্যমে লেনদেনও হয়। ২০১৮ সালে জুন মাসের ১৪ তারিখে তার দেওয়া প্রথম চেকটি প্রত্যাখ্যাত হয়। ৬৫ লাখ টাকা বাকি পড়ার পর থেকে মশিউরের আর হদিস পাচ্ছিলেন না বলে জানান মোতাহারুল।

শিল্প সচিবের দায়িত্ব নিলেন কে এম আলী আজম

Development by: webnewsdesign.com