জনপ্রিয় সংবাদ

x

যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত: শর্ত পূরণের পরও ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেই

শনিবার, ০৯ মার্চ ২০১৯ | ১২:৩০ অপরাহ্ণ | 199 বার

যুক্তরাষ্ট্রে জিএসপি সুবিধা স্থগিত: শর্ত পূরণের পরও ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেই

স্থগিতের ৬ মাসের মধ্যে মূল্যায়নের কথা বলা হলেও টানা ৬ বছর ধরে ঝুলে আছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের জিএসপি (রফতানিতে অগ্রাধিকার খাত) সুবিধা। ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত অব্যাহতভাবে এই সুবিধা ফিরিয়ে দেয়ার দাবি জানিয়েছে আসছে বাংলাদেশ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশটি যে শর্ত দিয়েছিল, তার প্রায় সব কটিই বাস্তবায়ন হয়েছে। এরপরও জিএসপি ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেই।

এ ক্ষেত্রে শুধু আশ্বাসেই সীমাবদ্ধ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ রোববার ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত তৈরি পোশাক খাতের মালিকপক্ষের সংগঠন বিজিএমইএ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করেন। জবাবে রাষ্ট্রদূত বলেছেন, তারা এ ব্যাপারে একটি লিখিত বার্তা দেবেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের গার্মেন্ট খাতে অস্থিরতায় ১১ হাজার শ্রমিক চাকরিচ্যুত হয়েছে বলে এ বৈঠকে অভিযোগ করেন রাষ্ট্রদূত রবার্ট মিলার।

তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিএসপি নিয়ে খুব বেশি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আশা করা যায় না। জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জিএসপি ফিরে পাওয়ার দাবি করতে হবে। কিন্তু এতে খুব বেশি লাভ হবে বলে মনে হয় না। কারণ কারখানার মানোন্নয়ন নিয়ে তারা বাংলাদেশ নয়, ইউরোপের ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড এবং উত্তর আমেরিকা ক্রেতা জোট অ্যালায়েন্সের রিপোর্টের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ দুই সংস্থা থেকে কী রিপোর্ট এসেছে, তা দেখতে হবে। তবে তিনি বলেন, জিএসপি সুবিধার আওতায় যেসব পণ্য ছিল, তা যুক্তরাষ্ট্রে মোট রফতানির ৫ শতাংশেরও কম। আর পোশাক খাতে তারা এ সুবিধা দেবে না বলে বহু আগেই জানিয়ে দিয়েছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের ২৪৩টি পণ্যের জিএসপি সুবিধা ছিল। খাতভিত্তিক বিবেচনায় মোট দাগে এ খাতগুলো হল : প্লাস্টিক, সিরামিক, গলফ খেলার উপকরণ, কার্পেট, চশমা, পতাকা, চুরুট ইত্যাদি। যদিও ওই তালিকায় তৈরি পোশাক ছিল না। কিন্তু ২০১৩ সালের এপ্রিলে রানা প্লাজা ধসে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় ওঠে। এর জের ধরে ওই বছরের জুনে যুক্তরাষ্ট্র সরকার জিএসপি স্থগিত করে। আর ১ সেপ্টেম্বর থেকে তা কার্যকর হয়। জিএসপি স্থগিত হওয়ার মানে হল, যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত বা শুল্কছাড় সুবিধা পেত, সেগুলো আর সুবিধা পাচ্ছে না।

ফলে এসব পণ্য রফতানিতে প্রচলিত হারে শুল্ক দিতে হচ্ছে। এতে পণ্যভেদে শুল্কহার ১২-২০ শতাংশ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই হারে শুল্ক দিয়ে রফতানি করায় দেশটির বাজারে পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়েছে বাংলাদেশ।

প্রসঙ্গত, জিএসপি সুবিধা স্থগিতের পর কারখানায় কাজের পরিবেশ উন্নয়নে ১৬টি শর্ত দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। আর এই শর্তগুলো পূরণ হলে ৬ মাস পর বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কিন্তু ২০১৩-২০১৯ পর্যন্ত ৬ বছর চলছে। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়ন না করে শুধু আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে। এরপর ২০১৫ সালে মোট ১২২টি দেশের জিএসপি সুবিধা নবায়ন করে যুক্তরাষ্ট্র। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ব্রাজিল, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, তুরস্ক, ভেনিজুয়েলা, ফিলিপাইন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া এবং থাইল্যান্ড। কিন্তু বাংলাদেশ ও রাশিয়াকে জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ১৬টি শর্তের ১৫টি পূরণ হয়েছে। একটি মামলার কারণে আটকে আছে। এ অবস্থায় আমরা তাদেরকে জিএসপি ফিরিয়ে দিতে বলেছি। তিনি বলেন, জিএসপি ফিরিয়ে দিলেও তেমন কোনো লাভ হবে না।

কারণ তৈরি পোশাকে (আরএমজি) যুক্তরাষ্ট্র জিএসপি দেয় না। এ কারণে জিএসপি ফিরিয়ে দেয়ার পাশাপাশি গার্মেন্ট খাতকে অন্তর্ভুক্ত করতে বলা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, রানা প্লাজার পর বাংলাদেশের শ্রমিক অধিকার ও মানবাধিকার পরিস্থিতির অনেক উন্নয়ন হয়েছে।

কিন্তু গত দু’বছরে এসব বিষয় নিয়ে কোনো মূল্যায়ন করা হয়নি। তিনি বলেন, জিএসপিতে কী প্রক্রিয়ায় এগোতে হবে, সে ব্যাপারে শিগগির একটি চিঠি দিয়ে তারা আমাদেরকে জানাবেন। সেই চিঠি পেলে আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।

জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে দুটি বিষয় বিবেচনায় করে জিএসপি সুবিধা দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে- শ্রমিকদের অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষা। মূলত তৈরি পোশাক শিল্প শ্রমিকদের প্রাণহানি ও কারখানার কর্মপরিবেশের জন্য জিএসপি স্থগিত করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে রোববারের বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, পোশাক খাতে অস্থিরতায় ১১ হাজারের বেশি শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। এর ব্যাখ্যায় বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে- দেশের শ্রমিক আইনে ৪টি পদ্ধতি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথমে অসদাচরণের জন্য কারণ দর্শাতে (শোকজ করা) বলা হয়। তবে কোনোভাবেই চাকরি হারানো শ্রমিকের সংখ্যা ৪ হাজারের বেশি না। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমিক ইস্যুতে জিএসপির বিষয়টি আবারও বিলম্বিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের রফতানিতে সম্ভাবনাময় খাতগুলোর অন্যতম হল প্লাস্টিক শিল্প। জিএসপি সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাজার বাড়াচ্ছিল প্লাস্টিক। কিন্তু এ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, জিএসপি স্থগিত হওয়ায় এ খাত বেকায়দায় পড়েছে। তাদের পণ্য রফতানি ব্যয় ২০ শতাংশের মতো বেড়ে গেছে। আর এ ব্যয় পুষিয়ে নেয়াটা সহজসাধ্য নয়। ২০১২ সালের পরের বছর থেকেই এসব পণ্যের রফতানি কমতে থাকে।

Development by: webnewsdesign.com